আনোয়ার হোসেন রকি, চট্টগ্রাম স্টাফ রিপোর্টার্স
জুলাই আন্দোলন ২০২৪। এই আন্দোলন শুধু একটি কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হয়ে শেষ হয়নি, বরং এটি একটি স্বৈরাচারী সরকারের পতনের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছে।
জুলাই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে। শুরুতে এটি ছিল ছাত্রদের একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন। “বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন” নামক একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে এর নেতৃত্ব দেওয়া হয়। তাদের প্রধান দাবি ছিল কোটা পদ্ধতি সংস্কারের হাইকোর্টের রায় পুনর্বহাল করা। কিন্তু, সরকার এই দাবি উপেক্ষা করে এবং ১৫ জুলাই তারিখে আন্দোলনের উপর দমন-পীড়ন শুরু হয়। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের উপর পুলিশের বর্বর হামলা, নির্বিচারে গুলি এবং ধরপাকড় পুরো দেশের মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। এই সহিংসতা ছিল আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মূল কারণ।
গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তর।
সরকারের দমন-পীড়ন যত বাড়তে থাকে, আন্দোলন তত বেশি শক্তিশালী হতে থাকে। ছাত্ররা তাদের দাবির সাথে যোগ করে সরকার পতনের এক দফা দাবি। দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, যেমন: শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী, নারী এবং সাধারণ জনগণ এই আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয়। দেশের প্রতিটি কোণ থেকে মানুষ ঢাকার দিকে যাত্রা শুরু করে, যা এক বিশাল গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। “৩৬ দিনের জুলাই” স্লোগানটি জনগণের দৃঢ়তার প্রতীক হয়ে ওঠে।
স্বৈরাচারী শাসনের পতন
আন্দোলন যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন দেশ অচল হয়ে পড়ে। দেশের অধিকাংশ জেলায় সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত বন্ধ হয়ে যায়। এক পর্যায়ে সেনাবাহিনীর প্রধান আন্দোলনকারীদের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেন, যা ছিল আন্দোলনের চূড়ান্ত বিজয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। জনগণের উত্তাল আন্দোলনের মুখে এবং সব দিক থেকে সমর্থন হারিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটে।
চট্টগ্রামে জুলাই আন্দোলনের মূল দিকগুলো:
জুলাই আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ প্রথম প্রজ্বলিত হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে। আন্দোলনটি দ্রুত চট্টগ্রাম শহরে ছড়িয়ে পড়ে। ১১ জুলাই শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জের পর পরিস্থিতি আরও উত্তাল হয়ে ওঠে। এর প্রতিবাদে পরদিন ১২ জুলাই হাজার হাজার শিক্ষার্থীর মিছিলে বন্দরনগরীর রাজপথ অচল হয়ে যায়।
এই আন্দোলনে চট্টগ্রামে বেশ কয়েকজন ছাত্র-জনতা শহীদ হন, যাদের মধ্যে শহীদ ওয়াসিম আকরাম, শহীদ ফয়সাল আহমেদ শান্ত, শহীদ মোহাম্মদ ফারুক, শহীদ ইশমামুল হক ও শহীদ ওমর ফারুক উল্লেখযোগ্য।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে চট্টগ্রামকে “বিপ্লবের অন্যতম দুর্গ” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এই জনপদ থেকেই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল বলে মনে করা হয়।
আন্দোলন দমাতে ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিপুল সংখ্যক গুলি, টিয়ারশেল এবং সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে অনেক বিক্ষোভকারী নিহত ও আহত হন।
সংক্ষেপে, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় চট্টগ্রাম ছিল আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, যেখানে ছাত্র-জনতা ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।
শহীদদের মোট সংখ্যা :
জুলাই আন্দোলনের শহীদদের মোট সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন ও সংস্থার মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।
সর্বশেষ তথ্য (সরকারি গেজেট অনুযায়ী) সরকার ৮৩৬ জনকে শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর আগে গেজেটে ৮৪৪ জনের নাম থাকলেও, যাচাই-বাছাইয়ের পর ৮ জনের নাম বাদ দেওয়া হয়।
আবার ওএইচসিএইচআর ( জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার) : তাদের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্ট অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৪০০। এর মধ্যে ১১৮ জন শিশু ছিল।
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের হিসাব অনুযায়ী, শহীদ ৮২০ জনেরও বেশি।
এই সংখ্যার তারতম্যের কারণ হলো, অনেক শহীদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত করা যায়নি, বিশেষ করে ঢাকার রায়েরবাজার কবরস্থানে গণকবরে দাফন করা শহীদদের।
যেহেতু পূর্ণাঙ্গ শহীদের তালিকা এখনও প্রকাশিত হয়নি, সূত্র থেকে যতটুকু জানা যায়:
১. শহীদ আবু সাঈদ: বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী।
২. শহীদ মো. ফারুক: আসবাবপত্রের দোকানের কর্মচারী।
৩. শহীদ মো. ওয়াসিম আকরাম: চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র।
৪. শহীদ ফয়সাল আহমেদ শান্ত: ওমরগনি এম. ই. এস কলেজের ছাত্র।
৫. শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ: বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) ছাত্র।
৬. শহীদ তাহির জামান প্রিয়: সাংবাদিক।
৭. শহীদ রিদোয়ান শরীফ রিয়াদ: টঙ্গী সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী।
৮. শহীদ আব্দুল আহাদ: ৪ বছর বয়সী শিশু, যিনি বাসার বারান্দায় গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন।
৯. শহীদ সাফকাত সামির: ১০ বছর বয়সী শিশু, মিরপুরে গুলিবিদ্ধ হন।
১০. শহীদ নাঈমা সুলতানা: ১৫ বছর বয়সী কিশোরী, উত্তরায় গুলিবিদ্ধ হন।
১১. শহীদ রিয়া গোপ: ৬ বছর বয়সী শিশু, নারায়ণগঞ্জে গুলিবিদ্ধ হন।
১২. শহীদ মো. সিয়াম: ১৫ বছর বয়সী শিশু, যিনি ভোলা থেকে ঢাকায় বেড়াতে এসেছিলেন।
এ ছাড়াও অনেক শহীদ রয়েছেন, যাদের নাম বিভিন্ন সময় প্রকাশিত হয়েছে। সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা এখনও শহীদদের পূর্ণাঙ্গ এবং নির্ভুল তালিকা তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
জনমতে বর্তমান ধারণা
জুলাই আন্দোলনের সুফল নিয়ে জনমতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। একদিকে যেমন অনেকেই একে একটি সফল বিপ্লব হিসেবে দেখছেন, অন্যদিকে কিছু উদ্বেগও প্রকাশ পাচ্ছে।
অনেকেই মনে করেন, জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এটি একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন তৈরি করেছে, যেখানে দুর্নীতি, স্বৈরাচার এবং বৈষম্য থাকবে না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কিছু পদক্ষেপ, যেমন দুর্নীতিবিরোধী অভিযান এবং বিচার ব্যবস্থার সংস্কারের উদ্যোগ, জনমনে আশার সঞ্চার করেছে।
কিছু মানুষ মনে করেন, আন্দোলনের ফলে একটি রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকেই অনিশ্চিত। এছাড়া, আন্দোলনের সময়কার সহিংসতা এবং প্রাণহানির ঘটনাগুলো এখনো অনেকের মনে ভীতির সঞ্চার করে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়েও জনমনে উদ্বেগ রয়েছে।
জুলাই আন্দোলনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন মেরুকরণ দেখা দিয়েছে। পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি নতুন নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ও রাজনৈতিক দলগুলোর উত্থান ঘটছে। তবে এই নতুন দলগুলো কতটা সফল হবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। অনেকে মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলনের কৃতিত্ব দাবি করতে চাইছে, যা আন্দোলনের মূল চেতনা থেকে বিচ্যুত।
কিছু বিশ্লেষক এবং সাধারণ মানুষ মনে করেন, আন্দোলনের মূল সুফলগুলো এখনও সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়নি। তারা বলছেন, রাজনৈতিক পরিবর্তন এলেও সমাজে বৈষম্য ও দুর্নীতির শেকড় এখনো অনেক গভীরে। আন্দোলনের শহীদদের পরিবারের প্রতি দায়িত্ব এবং আহতদের সুচিকিৎসার বিষয়টিও এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি।
জুলাই আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে যে, যখন দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন কোনো স্বৈরাচারী শক্তিই তাদের সামনে টিকতে পারে না। এটি কোনো রাজনৈতিক দলের আন্দোলন ছিল না, ছিল সাধারণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ। এই বিপ্লব আমাদের নতুন করে স্বপ্ন দেখিয়েছে একটি বৈষম্যহীন এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ার। এই আন্দোলনের শহীদদের আত্মত্যাগ আমাদের চিরকাল মনে করিয়ে দেবে যে, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার অর্জন করতে হলে সাহসিকতা এবং ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।